প্রতিনিধি 22 August 2026 , 6:13:34
এম এ কাদের, মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি :


মাত্র ২৫ হাজার টাকা মাসিক বেতনের চাকরি। অথচ আট বছরের ব্যবধানে মাটির ঘর ছেড়ে গ্রামে গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল বাড়ি। জমি-জমা ও অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা—এমন দাবি স্থানীয়দের। কীভাবে অল্প সময়ে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন নিশান সোসাইটির সাবেক এরিয়া ম্যানেজার জামাল মিয়া, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের সাহেবনগরসহ আশপাশের এলাকায়। জামালের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নিশান সোসাইটির এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় গ্রাহকদের আস্থা ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা আমানত হিসেবে সংগ্রহ করেন তিনি। পরে এসব অর্থ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রথমদিকে কয়েক মাস নিয়মিত মুনাফা দেওয়ায় জামালের প্রতি তাঁদের আস্থা তৈরি হয়। পরে সেই আস্থাকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের পরিচিতজনদের কাছ থেকেও বড় অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করেন তিনি। একপর্যায়ে আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া বন্ধ করে দেন জামাল। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ তাঁদের। কয়েকজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মনির মিয়ার কাছ থেকে ৭ লাখ, সুমন মিয়ার কাছ থেকে ৮ লাখ, মীর হৃদয়ের কাছ থেকে ৫ লাখ, মোশাররফ হোসেনের কাছ থেকে ১৭ লাখ, পারভীন আক্তারের কাছ থেকে ৮ লাখ, জাহাঙ্গীর মিয়ার কাছ থেকে ১৪ লাখ, নার্গিস আক্তারের কাছ থেকে ১৩ লাখ, বাবু মিয়ার কাছ থেকে ৮ লাখ এবং আরেক মোশাররফ হোসেনের কাছ থেকে ১৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে জামালের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া বিজয়নগর উপজেলার মেঘশিমুল গ্রামের এমদাদ জানান, জামাল তাঁর কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। এখন তাঁর সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছেন না তিনি। ভবানীপুর গ্রামের মোশাররফ হোসেনের অভিযোগ, জামালকে বিশ্বাস করে তিনি ২০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। বর্তমানে সেই টাকা ফেরত পাওয়া তো দূরের কথা, জামালের সঙ্গেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ‘মুনাফা দিয়ে বিশ্বাস, পরে টাকা নিয়ে উধাও’ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, টাকা নেওয়ার পর কয়েক মাস নিয়মিত মুনাফা দেওয়ায় তাঁরা আরও বেশি আস্থাশীল হয়ে পড়েন। পরে সেই সুযোগে তাঁদের মাধ্যমে পরিচিত আরও অনেকের কাছ থেকেও টাকা সংগ্রহ করেন জামাল। কিন্তু বড় অঙ্কের টাকা নেওয়ার পর একপর্যায়ে মুনাফা ও মূলধন ফেরত দেওয়া বন্ধ করে দেন তিনি। ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু সাহেবনগর নয়, মাধবপুর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার বহু মানুষ জামালের কাছে টাকা দিয়ে এখন বিপাকে পড়েছেন। সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও জামালের আর্থিক অবস্থা ছিল সাধারণ। সাহেবনগর গ্রামে তাঁর বসতঘর ছিল মাটির তৈরি। তবে নিশান সোসাইটিতে চাকরির পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে বলে স্থানীয়দের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি বিপুল জমি-জমা, বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদের মালিক হয়েছেন। সাহেবনগরে পুরোনো মাটির ঘরের জায়গায় নির্মাণ করেছেন ব্যয়বহুল বাড়ি। স্থানীয়দের প্রশ্ন, মাসে ২৫ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করে আট বছরের মধ্যে কথিত কোটি কোটি টাকার সম্পদ কীভাবে গড়ে উঠল? তবে জামালের কথিত ২০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাঁর নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি, বাড়ি, ব্যাংক হিসাবসহ অন্যান্য সম্পদের দলিলপত্র যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার দাবি ভুক্তভোগীদের দাবি, আমানতের টাকা ফেরত চাওয়ার পর জামালের বিরুদ্ধে চেক প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বলেও দাবি তাঁদের। বর্তমানে জামাল আত্মগোপনে রয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে এসব মামলার সংখ্যা, মামলা নম্বর, আদালতের আদেশ এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি জামালকে জামালের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর স্ত্রী হাসিনা বেগম স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘কিছু দুষ্টু প্রকৃতির মানুষ আমাদের ক্ষতি করতে উঠেপড়ে লেগেছে। তারা নানা অভিযোগ করছে। আল্লাহ সহায় থাকলে কেউ আমাদের কিছু করতে পারবে না।’ সুষ্ঠু তদন্তের দাবি ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথায় গেছে, এসব টাকা নিশান সোসাইটিতে জমা হয়েছিল কি না, জামাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে এবং এসব সম্পদের বৈধ উৎস কী—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে আমানতের টাকা উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে জামালের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং আদালতের কোনো পরোয়ানা থাকলে তা আইনানুগভাবে কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

















