• জাতীয়

    আনুষ্ঠানিক ভাবে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হলো মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কে

      প্রতিনিধি 13 August 2026 , 7:36:47

    দেশ আমার ডেস্ক:

    শুরুটা বাকি সবার মতোই ছাত্ররাজনীতি দিয়ে। এরপর শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিন একটি বড় রাজনৈতিক দলের মহাসচিব— বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ও কর্মজীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।

    বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনের কাছে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র জমা দেয়। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হলো।

    এর আগে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় বৈঠকে মির্জা ফখরুলের নাম রাষ্ট্রপতি পদে চূড়ান্ত করেন। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের শুরুতেই এ সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।

    রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার কারণে মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। বর্তমানে তিনি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

    যখন থেকে শুরু ছাত্ররাজনীতি

    ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী, পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। তার মা মির্জা ফাতেমা আমিন।

    ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

    বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই তার রাজনৈতিক হাতেখড়ি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সময়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময়ও তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।

    ছাত্রজীবনের বামপন্থী রাজনীতি থেকে পরবর্তীতে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সঙ্গে যুক্ত হন। সেখান থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে তার পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।

    শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি

    রাজনীতির পাশাপাশি কর্মজীবনেও বৈচিত্র্যের ছাপ রয়েছে মির্জা ফখরুলের। অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজেও শিক্ষকতা করেন।

    এরপর তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

    তবে সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি মনোনিবেশের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন তিনি।

    পৌর চেয়ারম্যান থেকে জাতীয় রাজনীতিতে

    চাকরি ছাড়ার পর স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এই জয় তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে।

    নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান শক্ত হয়। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের পদে আসীন হন।

    ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

    সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী

    ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বিএনপি সরকারের আমলে তিনি প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

    ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হন। তবে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

    বর্তমান সরকারের দায়িত্বেও মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংসদে তার আসন প্রধানমন্ত্রীর আসনের পাশেই বলে জানা গেছে।

    কঠিন সময়ে বিএনপির ভরসার মুখ

    মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি এসেছে দলের কঠিন সময়গুলোতে। ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপিকে নানা রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।

    দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সাল থেকে প্রায় দুই বছর কারাবন্দী ছিলেন। পরে অসুস্থতার কারণে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে সরে যান। অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশ ছাড়ার পর লন্ডন থেকে দল পরিচালনা করে আসছিলেন।

    দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে দেশে বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে মির্জা ফখরুলই হয়ে ওঠেন অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে একাধিকবার কারাবরণও করতে হয়েছে তাকে।

    দীর্ঘ এই সময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনায় তার ভূমিকার কথা বিএনপির নেতারা বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছেন। সহনশীলতা, ধৈর্য এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার কারণে দলীয় পরিসরে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ঐক্যের প্রতীক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন।

    মহাসচিব থেকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী

    ২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। প্রায় পাঁচ বছর এই দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলটির শীর্ষ সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন।

    ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, সংসদীয় রাজনীতি, মন্ত্রিত্ব এবং দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার তিনি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন।

    ৭৮ বছর বয়সী এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের রাজনৈতিক জীবনের প্রায় ছয় দশকের পথচলার পর নতুন এক অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। দলীয় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই পথচলা এখন বঙ্গভবনের দিকে এগোচ্ছে।

    পারিবারিক জীবন

    ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।

    তার স্ত্রী একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

    তৃণমূলের রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা এখন নতুন এক সন্ধিক্ষণে।

    রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ পথচলা পৌঁছেছে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ পাওয়ার সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে।

    আরও খবর

                       

    জনপ্রিয় সংবাদ

    নোটিশ :